বিমসটেক যুব নেতৃত্বাধীন জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন

- আপডেট সময় : ০৩:৫৫:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ মার্চ ২০২৫ ৫ বার পড়া হয়েছে
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে, যার মোকাবিলায় যুবসমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতায় সম্প্রতি (২০-২৪ ফেব্রয়ারি ২০২৫) ভারতের নয়াদিল্লির বিশ্ব যুবক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত বিমসটেক যুব নেতৃত্বাধীন জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এই সম্মেলন শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করার একটি প্ল্যাটফর্ম ছিল না, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করেছে। এখানে যুবসমাজ কীভাবে নিজেদের ভূমিকা আরও কার্যকর করতে পারে, সে সম্পর্কে দীক্ষা লাভ করেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ভারত স্কাউটস অ্যান্ড গাইডস কর্তৃক আয়োজিত এই সম্মেলনে বিমসটেকভুক্ত সাতটি দেশের (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মায়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড) ১২২ জন যুব প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রতিনিধিত্ব করেছেন ১৪ জন, যার মধ্যে ৩ জন রোভার স্কাউট লিডার এবং ১১ জন রোভার স্কাউট। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা একত্রিত হয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন।
সম্মেলনের উদ্বোধন করেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মানিত সচিব (পূর্ব) জনাব জয়দীপ মজুমদার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারত স্কাউটস অ্যান্ড গাইডস এর প্রধান জাতীয় কমিশনার ড. কে. কে. খান্ডেলওয়াল, বিমসটেকের মহাসচিব জনাব ইন্দ্র মণি পান্ডে, বিশ্ব স্কাউটস এর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব জনাব ডেভিড বার্গ, স্কাউটসের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক জনাব জোসে রিজাল পাঙ্গিলিনান এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অতিথিরা। এই অনুষ্ঠান আমার জন্য এক বিশেষ মুহূর্ত ছিল, যখন আমি দেখলাম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা যুব প্রতিনিধিরা তাঁদের নিজ নিজ দেশের সংস্কৃতি তুলে ধরছেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তাবনা উপস্থাপন করছেন।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের সেশনে উপস্থিত ছিলেন ড. আনন্দজিৎ গোস্বামী, যিনি আমাদের পৃথিবী সম্পর্কে অত্যন্ত শিক্ষামূলক ধারণা প্রদান করেন। তিনি পৃথিবীর উষ্ণায়ন এবং এর প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁর উপস্থাপনা বাস্তবসম্মত ও সহজবোধ্য ছিল, যা আমাদের অনেককেই নতুনভাবে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি পৃথিবীকে একটি “উদ্ভিদ পাত্রের” সাথে তুলনা করেন, যা তাপ ধরে রাখে এবং আমাদের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে। তাঁর আলোচনা সম্মেলনের মূল লক্ষ্যকে আরও সুস্পষ্ট করেছে, যুবসমাজকে জলবায়ু পরিবর্তনের গভীরতা ও এর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা।
এই সম্মেলন আমাদের শিখিয়েছে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে, এবং সে লক্ষ্যে যুবসমাজকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। অপর এক সেশনে, ইউনিসেফের ড. নির্মা বোরার নেতৃত্বে জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার সাথে যুক্ত শিশু অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি শিশু অধিকার সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং ইউনিসেফের শিশুদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।
এতে তিনি যুবকদের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাদের দায়িত্ব ও উদ্যোগ গ্রহণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন রাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল ভারতের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক মন্ত্রী ড. মনসুখ মান্ডভিয়ার উপস্থিতি। তিনি ইন্ডিয়া নাইট শো-এ অংশ নেন এবং তরুণ প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তার উপস্থিতি আমাদের সকলকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে, তিনি তরুণদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উদ্বুদ্ধ করার পদেক্ষপ গ্রহণ করার জন্য ভারত স্কাউটস এর প্রশংসা করেন।
সম্মেলনের তৃতীয় দিনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেশন ছিল “কার্যকর যোগাযোগ এবং অ্যাডভোকেসি”, যা পরিচালনা করেন গুরজিৎ কৌর চাওলা, ডিন, ছাত্র কল্যাণ, মানব রচনা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজ।
তিনি আলোচনা করেন কিভাবে কার্যকরীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। “আমরা স্কাউট, আমরা পথপ্রদর্শক, আমরা রক্ষাকারী, আমরা ত্যাগী”, এই স্লোগানটি মনে রেখে তিনি আমাদের শেখান কিভাবে আমাদের কথাগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় বা অন্য কোনও মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা যায় যাতে তা মানুষের মনে প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা একটি মজাদার গেমও খেলেছিলাম, যেখানে আমরা সূর্য, পৃথিবী এবং গ্রীনহাউস গ্যাসের চরিত্রে অভিনয় করে দেখিয়েছিলাম কিভাবে গ্রীনহাউস গ্যাস পৃথিবীর উত্তাপ আটকে রাখে। এই গেমটি ছিল খুবই শিক্ষণীয় এবং উপভোগ্য, যা সম্মেলনের সফল সেশন হিসেবে চিহ্নিত হয়।
এই দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ইন্টারন্যাশনাল নাইট এই দিনে প্রতিটি দেশের স্কাউটরা নিজ দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পোশাক, খাবার ও ইতিহাস উপস্থাপন করে। আমরা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি পরে আমাদের স্টলে উপস্থিত ছিলাম। আমরা অতিথিদের বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করি এবং দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দিই।
সম্মেলনের চতুর্থ দিনে আমাদের জন্য একটি শিক্ষা সফর আয়োজন করা হয়, যেখানে আমরা বিমসটেক সচিবালয় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করি। বিশেষভাবে, বিমসটেকের সুপার কম্পিউটার ল্যাব পরিদর্শনের সুযোগ পাই, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস ও গবেষণা কীভাবে পরিচালিত হয়, তা সরাসরি দেখার সুযোগ হয়।
এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্লভ ও শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা ছিল, কারণ আমরা বাস্তব জীবনের উদাহরণের মাধ্যমে জানতে পারি, কীভাবে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিক্ষা সফরের সময় আমাদের জানানো হয় যে, বিমসটেক এখন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গবেষণা, যুব নেতৃত্ব উন্নয়ন এবং স্কলারশিপ প্রদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। বিশেষত, পরিবেশ বিজ্ঞান, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি নিয়ে গবেষণার জন্য বিমসটেকের একটি বিশেষ স্কলারশিপ প্রোগ্রাম চালু হতে যাচ্ছে, যা দ্বারা বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থী ও গবেষকগণ সরাসরি উপকৃত হবে।
সম্মেলনে আমাদের টিম ‘ভাসমান হাউজ’ প্রজেক্টটি উপস্থাপন করে, যা সকলের ভূয়সী প্রশংসা লাভ করে। এটি বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য একটি অত্যন্ত উদ্ভাবনী ও টেকসই আবাসন সমাধান। বাংলাদেশে বন্যা একটি চলমান বিপর্যয় যা প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটে। দেশের নিম্নভূমি, যেখানে অধিকাংশ ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫ মিটার বা তারও নিচে, যা বন্যার সময় সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার স্বীকার হয়। বন্যার চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য ‘ভাসমান হাউজ’ প্রজেক্ট একটি কার্যোপযোগী আবাসন সমাধান প্রদান করেবে যা বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য উপযোগী।
সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক আর্মি চিফ জেনারেল দালবির সিং সুহাগ। তিনি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু আন্দোলন এবং পরিবেশগত প্রচারের কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন এবং এই সম্মেলনের গতি ও প্রাণশক্তির প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যৎ জলবায়ু নীতির জন্য এর গুরুত্ব তুলে ধরেন। সম্মেলনের সুপারিশসমূহ বিমসটেক কর্মকর্তাদের কাছে তুলে দেওয়া হয়, যা উচ্চ পর্যায়ে আলোচনায় যোগ্যতার জন্য অবহিত করা হবে। এই জলবায়ু কর্মকান্ডে দক্ষিণ এশিয়ার যুব নেতৃত্বকে আরও তীব্র এবং কার্যকরীভাবে একত্রিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠেছে।
সম্মেলন শেষে আমি মনে করি যে আমরা সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি, যেমন: ১. জলবায়ু সচেতনতা কর্মশালা: স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। ২. পরিবেশবান্ধব জীবনধারা প্রচার: প্লাস্টিক বর্জন, বনায়ন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করা। ৩. স্থানীয় যুবদের সম্পৃক্ত করা: বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা। ৪. জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প: বন্যা, খরা ও অন্যান্য জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রম পরিচালনা করা।
এই সম্মেলনটি আমাকে শুধু পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে সহায়তা করেনি, বরং আমাকে এবং আমাদের স্কাউটদের এমন কিছু আদর্শ শেখাতে সাহায্য করেছে যা আমাদের নিজেদের সমাজে পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা শুধু আমাদের দেশেই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়–ক, এই লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করব। সম্মেলনটি আমার জন্য ছিল এক অভিজ্ঞতার সমাহার, যা আমাকে আমার দায়িত্ব আরো গভীরভাবে অনুভব করতে সহায়তা করেছে। আমি মনে করি এটি আমাদের একটি বার্তা দেয়, যে আমাদের কাজের মাধ্যমে, বিশেষ করে যুবসমাজের মাধ্যমে, পৃথিবীকে আরও ভালো জায়গা নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আমাদের আরও কিছু করতে হবে, এবং আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, এই সম্মেলনে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা সবাই মিলিত হয়ে প্রকৃত পরিবর্তন আনব। এই সম্মেলন শুধুমাত্র একটি ইভেন্ট ছিলো না বরং এটি একটি আন্দোলন ছিলো যা যুবকদের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করছে। আমরা, বাংলাদেশি প্রতিনিধিরা, সম্মেলন থেকে অমূল্য শিক্ষা গ্রহণ করেছি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়েছি, এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নতুন উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছি। এই সম্মেলনের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে যে যুবকরাই কেবল ভবিষ্যতের নেতা নয়, বরং বর্তমানের পরিবর্তনকারী শক্তি। আমরা বিশ্বাস করি যে সম্মেলনের মাধ্যমে গৃহীত উদ্যোগসমূহ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি আরও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
নাজমুল হাসান (পিআরএস, উডব্যাজার)
রোভার স্কাউট লিডার
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এয়ার রোভার স্কাউট গ্রুপ